বাঙালির আত্মানুসন্ধান

না, মোহনবাগান  বা ইস্ট-বেঙ্গল নিয়ে তর্কা-তর্কি করার স্পর্ধা বা ইচ্ছে,- কোনোটাই আমি রাখিনা। ঔদ্ধত্য নয়,- বরং এটা আমার ফুটবল সম্পর্কে কিছুটা অজ্ঞাত থাকার স্বীকারোক্তি বলতে পারেন। কিন্তু অল্প বয়সপ্রাপ্ত হতেই এইটুকু জেনেছি, যে মোহনবাগান মানেই ‘ঘটি’, আর ইস্ট বেঙ্গল মানে ‘বাঙাল’ । 

বাংলার বাইরে দিল্লিতে যখন পড়াশুনা করতাম,তখন ভিন্ন-ভাষীদের জনসমুদ্রে কারোর মুখে একটু বাংলা শুনতে পেলেই তাকে খুব কাছের মনে হতো। কলকাতা এসে দেখলাম,শুধু তাই দিয়ে কাজ চলে না। সরাসরি জিজ্ঞেস না করতে পারলেও,স্কুল এবং পরবর্তী জীবনের অনেক বন্ধুরাই এসে জিজ্ঞেস করেছে, “তুই কিসের সাপোর্টার? ইস্ট-বেঙ্গল না মোহনবাগান??”  বুঝতে পারতাম সে জানতে চাইছে অন্য কিছু, – ফুটবল টা ছুঁতো মাত্র। আর দেখতাম অন্য রাজ্যের বন্ধুদের এই বিভাজন-জনিত কথা কাটাকাটি তে কিঞ্চিৎ আনন্দ উপভোগ করতে। এরপর লক্ষ্য করেছি কিভাবে একে-অপরের (কু)স্বভাব/আচরণ দেখে তাকে ‘ঘটি’ অথবা ‘বাঙাল’ তকমা দিয়ে আর নাক-সিঁটকিয়ে বাঙালি খুব সন্তুষ্ট বোধ করে। আলাপ-পরিচিতির সূত্রে সে করতে চায় অন্যের ‘দেশের বাড়ির’ খোঁজ। সোশ্যাল-মিডিয়া জুড়ে একে-অন্যের ব্যঞ্জন-রান্না নিয়ে ব্যঙ্গ করতেও বাঙালির বেশ লাগে। আর ইস্ট বেঙ্গল- মোহনবাগান এর লড়াই নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না । সামনা-সামনি প্রকট না হলেও,প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের মাধ্যমে এই ধরণের স্বভাবে প্রায় প্রত্যেক বাঙালি-ই আবদ্ধ। 

আবার এই বাঙালি-ই বিশ্বকাপের ম্যাচে ভারত এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত শুনে আবেগে মেতে ওঠে,- ফেসবুক জুড়ে সেই ভিডিও কে সে করে তোলে ‘ভাইরাল’। ১৯০৫ সালে বঙ্গ-ভঙ্গের তীব্র প্রতিবাদে এবং অবিভক্ত বাংলার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’। যেই গানে বর্ণনা রয়েছে একই বাংলার নদীর কূল,বটের মূল এবং আমের বন-এর। তবে আজ সেই গান শুধু এক বাংলার জাতীয়তাবাদের প্রতীক। সেই পূর্ব বাংলা,- যেটি ধর্মের ভিত্তিতে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও পরবর্তী কালে রুখে দাঁড়ায় নিজের ভাষার জন্যে। সেই বাংলাদেশ,- যেটি মুক্তি-যুদ্ধের লড়াই-এ ধর্মনিরপেক্ষ ভাবে জন্ম-গ্রহণ করলেও পরবর্তী কালে এবং বর্তমানে আবারও পড়েছে সেই ধর্মের-ই প্রকোপে। বিশ্বে হয়তো প্রথমবার একটি জাতি স্বপ্ন দেখেছিল শুধু মাত্র ভাষার ভিত্তি-তে দেশ গড়ার। কিন্তু ভাষা আমাদের এক রাখতে পারেনি,- এটাই নির্মম সত্য। শেষ-মেশ জয় হয়েছে সেই দ্বি-জাতি তত্ত্বেরই। তাই কবিগুরুর সোনার বাংলা আজ বিভক্ত। দ্বিখন্ডিত আজ সেই রূপসী বাংলা, – যার মুখ দেখে আরেক কবি পৃথিবীর রূপ-ও আর খুঁজতে যেতে চাননি। 

তবে এ তো হল বাংলাদেশের কথা। এবার আসি ভারতে। যেই ভারতের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভীষণ ভাবে নাড়া দেয় রাঢ় বাংলার বিপ্লবী কবি,এবং পরবর্তী কালে বাংলাদেশের জাতীয় কবি,- কাজী নজরুল ইসলাম কে। সেই ভারত,যার স্বাধীনতার  উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম-এর এক স্কুল শিক্ষক নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছিলেন,- মৃত্যুক্ষণেও যাঁর উপর অমানবিক অত্যাচার চালান ইংরেজ-রা। ইউ-টিউবে একদিন খুঁজে দেখেছিলাম, আজ সেই মাষ্টারদার বাড়ি পরিণত হয়েছে বাংলাদেশের এক ছোট কমিউনিটি হেলথ ক্লিনিকে,- যার তাৎপর্য্য আশে-পাশের বেশিরভাগ মানুষ-ই জানেন না। এমনই বীরত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন সুভাষ বসু, বাঘা-যতীন,কল্পনা দত্ত,প্রীতিলতা,ক্ষুদিরাম,বীণা দাশ,রাসবিহারী বসু এবং আরো অনেকেই,-যাঁরা নিজেদের পরিচিতি বাঙালির চেয়েও বেশি,- ভারতীয় হিসেবে রাখতে গর্ববোধ করতেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যাঁরা কেউই তাঁদের উচিত মর্যাদা পান নি। 

কিন্তু আজ ভারতের বাঙালি কোথায় দাঁড়িয়ে? আজ কি সে এই মহামানবদের ভারতীয় ভাবে? নাকি ভারতীয় তো পরের কথা, সে এখন তাঁদের  আর বাঙালি ও ভাবতে পারেনা? ইস্ট-বেঙ্গলের শতবর্ষ পূর্তির আনন্দ কে অনেকেই দেখলাম ব্যক্ত করেছেন সূর্য সেন,জীবনানন্দ দাশ আর সত্যজিৎ রায়ের নাম জড়িয়ে। মোহনবাগান হলে নিশ্চয়ই মহান ‘ঘটি’দের নাম তোলা হতো। যাঁরা বাংলা এবং ভারত কে ভালোবেসেছে প্রাণের চেয়েও বেশি,- তাদের সাথে এ কি রকম ভাগ্যের পরিহাস! 

না,আবারো বলি,আমি কোনো দলেরই খেলাটির প্রতি আবেগ বা ভালোবাসা কে ছোট করছিনা। গর্বের সাথে দুই টিমের খেলোয়াড় দের জানাই আমার শুভেচ্ছা, এবং আশা রাখি তাঁরা বাঙালির ফুটবল-প্রেম কে আন্তর্জাতিক স্তরে  নিয়ে যাবেন। কিন্তু খেলা কে খেলার পর্যায়েই রাখুন। নিজেদের বিভক্ত করে এই জাতির ইতিহাস এবং মহাপুরুষদের ছোট করবেন না,দোহাই। গর্ব করুন বাঙালির সারল্য নিয়ে,- যা পথের পাঁচালীর গ্রাম বাংলায় আবহমান। গর্ব রাখুন গুপী-র সেই গানের ভাষায়,- যার মিষ্টতায় শুন্ডী -র রাজা বিস্মিত হন। গর্ব করুন রবি ঠাকুরের  ‘দেখে দেখে আঁখি না ফিরে…’, – সেই  সুসজ্জিত বাংলায়। গর্ব করুন নেতাজি এবং মাষ্টারদার বিশ্ব-কাঁপানো দেশপ্রেম এবং স্পর্ধায় । 

-অভীপ্সা রায় ।

3 thoughts on “বাঙালির আত্মানুসন্ধান

Leave a comment